ত্রিপুরায় মাতৃভাষায় শিক্ষার হদ্দমুদ্দঃ চাকমা ভাষা প্রেক্ষিত-ফুল সদক চাকমা


Placard-6

গত ১৪ই আগস্ট ২০১২ মহাসাড়ম্বরে উদ্বোধন হয়ে গেল ককবরক ও সংখ্যালঘু ভাষা উন্নয়ণ ডিরেক্টরেটের। এর এক সপ্তাহ আগে অর্থাৎ ৭ই আগস্ট ঘোষণা করা হয়েছিল চাকমা ভাষাকে চাকমা হরফে চালু করার ক্যাবিনেট সিদ্ধান্ত। স্বভাবতই ত্রিপুরাবাসী চাকমা জনগণ আবেগে আপ্লুত। যার ফলে ১৬ই আগস্টের ত্রিপুরা রাজ্য চাকমা হরফ দাবী কমিটির বিশাল বিক্ষোভ মিছিলটি বিজয় মিছিলে (প্রকারান্তরে বামফ্রন্ট সরকারকে অভিনন্দন জানানোর মিছিলে) পরিনত হয়ে গিয়েছিল। এখানে বামফ্রন্টের, বিশেষভাবে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের কূটনীতির প্রশংসা করতেই হয়। জানা যায় ১৬ই আগস্ট মুখ্যমন্ত্রী চাকমা হরফ দাবী কমিটির প্রতিনিধিগণকে চাকমা ভাষা উন্নয়নের সকল প্রকার সাহায্য দান তথা অতি সত্বর চাকমা হরফে পাঠ দানের কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে চাকমা ভাষা-ভাষী জনগণ তাদের আন্দোলনের মাধ্যমে কি অর্জণ করেছেন তারা নিজেও জানেন না এবং আমার স্থির বিশ্বাস আন্দোলনকারীগণকে মূখ্যমন্ত্রী সঠিক কি দিয়েছেন তিনি সেটা নিজেও জানেন না। কেন একথা বলছি সে ব্যাপারে পরে আসছি।

সরকারের তথ্য মোতাবেক বর্তমানে ত্রিপুরায় ৯৪৩ টি স্কুলে ককবরক, ৫৮ টি স্কুলে চাকমা, ৪৯ টি স্কুলে হালাম-কুকি, ৩৬ টি স্কুলে বিঞ্চুপ্রিয়া মণিপুরি ও ২৮ টি স্কুলে মণিপুরী ভাষায় পড়ানো হচ্ছে। অর্থাৎ সরকার ত্রিপুরার আদিবাসীদেরকে বা সংখ্যালঘু ভাষার জনগোষ্ঠীদেরকে ১১১৪ টি স্কুলে মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু মাতৃভাষায় শিক্ষা পাওয়ার অধিকার দানের নামে ককবরক, বিঞ্চুপ্রিয়া মণিপুরী, মণিপুরী ও হালাম-কুকি ভাষা-ভাষীদের কি হচ্ছে জানা না গেলেও চাকমা ভাষায় শিক্ষা দানের নামে যে ছেলে খেলা হচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে যে কি ভয়াবহ ফলাফল বয়ে আনবে তা ভগবানই একমাত্র জানেন।

২০০৪ সালের মাতৃভাষা দিবসে পেচারতল অঞ্চলের ৬ টি বিদ্যালয়ে (পরবর্তীতে তাতে আরও ৩ টি বিদ্যালয় যোগ করা হয়) চাকমা ভাষায় শিক্ষাদানের ঘোষণার মাধ্যমে ত্রিপুরাবাসী চাকমা জনগণের মাতৃভাষায় শিক্ষায় অধিকার পাওয়ার যাত্রা শুরু হয়। তা ২০০৭ এর ৬ আগস্ট ২০ টি স্কুলে ও ২০১০ এর ২ মার্চ আরও ২৯ টি স্কুলে সম্প্রসারিত হয়। বর্তমানে মোট ৫৮ টি স্কুলে সরকারী ভাষ্য মোতাবেক চাকমা ভাষায় পাঠদান চলছে।

২০০৪ সালে যখন চাকমা ভাষায় শিক্ষাদানের ঘোষণা করা হয় তখন চাকমা জনপদ গুলিতে কিছুটা হলেও খুশীর হাওয়া বয়ে যায়। কিছুটা বলছি এ কারনে যে তাদের সবার ইচ্ছে ছিল মাতৃভাষাকে নিজস্ব হরফে পাওয়ার। কিন্ত তা করা হয় বাংলা হরফে। যার ফলে অনেকেই তার বিরোধ করতে থাকে। তা সত্তে¡ও কোন কোন মহল থেকে যথেষ্ঠ উৎসাহ দেখানো হয়। হাজার হোক মাতৃভাষা বলে কথা। তা যে কোন হরফেই হোক না কেন। কিন্তু ঘোষণার পরে সত্যি সত্যি বিদ্যালয়ে চালু হওয়ার পর চাকমা জনগণ অবাক হয়ে দেখল মাতৃভাষায় শিক্ষার নামে যেটা দেওয়া হয়েছে সেটা একটা মস্ত ফাঁকি ছাড়া আর কিছু ছিল না।

প্রথমতঃ, চিহ্নিত বিদ্যালয় গুলিতে চাকমা ভাষায় শুধু একটি মাত্র বিষয় চালু করা হল। বলা হল সেই বিদ্যালয়ে পাঠরত চাকমা ছাত্র-ছাত্রীরা ইচ্ছে করলে অতিরিক্ত একটি বিষয় (অর্থাৎ চাকমা) নিতে পারবে।

দ্বিতীয়তঃ, এখানে মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রাথমিক শর্তটিই (কারন এখানে শিক্ষার মাধ্যম অন্য ভাষাই থেকে যাচ্ছে) লঙ্ঘিত হল। অধিকন্তু অধিকার পাওয়া জনগোষ্ঠীর কোমলমতি ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দু’দুটি ভাষার বোঝা বহন করতে বাধ্য করা হল। জানা গেছে ১৬ই আগস্ট সাক্ষাতকারকালে মুখ্যমন্ত্রী সব বিষয় গুলি চাকমা ভাষায় করা অথবা একটি বিষয়েই সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্তটি চাকমা হরফ দাবী কমিটির প্রতিনিধিদের উপর ছেড়ে দিলেও বিষয়ান্তরে তিনি একটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষেই সওয়াল করেছেন। অর্থাৎ সোজা কথায় তিনি মাতৃভাষায় শিক্ষার বিপক্ষে রায় দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি নাকি ককবরক ভাষায় পাঠরত ছাত্র-ছাত্রীদের উত্তোরত্তর খারাপ ফলাফলের কথা উল্লেখ করেছেন। ককবরক ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করলে নাকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি ডিঙিয়েও (মানে ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠলেও) ছাত্র-ছাত্রীরা নিজের নাম দস্তখত করতে পারে না। এটা যে ত্রিপুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলিতে প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তবতা তা স্বীকার না করে তিনি দোষ চাপিয়ে দিয়েছেন ককবরক ভাষার উপর। সকল কালের সকল দেশের শিক্ষাবিদদের মতামতকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলতে চেয়েছেন, মাতৃভাষার বদলে অন্য ভাষায় শিক্ষা দিলেই ছাত্র-ছাত্রীরা ভাল শেখে। স্বাধীনতার ৬৬ বছর পরে এই প্রকারের ঔপনিবেশিক মানসিকতা সত্যিই দুঃখজনক। তবে হ্যাঁ, ত্রিপুরার লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা বা যোগাযোগের ভাষা হিসেবে বাংলাকে এবং ভারতের কমার্সিয়াল বা উপার্জনের ভাষা হিসেবে ইংরেজিকে আমরা কখনোই অস্বীকার করতে পারবো না। তাই বলে আমরা একটি অবুঝ শিশুকে সে ভাষাগুলি শেখানোর মাধ্যমে তার জীবনের শিক্ষার পর্ব শুরু করতে চাইবো তা কোন শিক্ষাবিদই সমর্থন করবেন না।

তৃতীয়তঃ, চাকমা ভাষা-ভাষী ছাত্র-ছাত্রীদের অতিরিক্ত একটি বিষয় পড়ানোর কারনে তাদের পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে অন্যান্য ভাষার ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার ফলাফল তুলনা করা দুরূহ হয়ে উঠল। কারন একটি বিষয় বেশী হওয়ার কারনে স্বভাবতঃই চাকমা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাপ্ত মোট নম্বর বেশী হয়ে যাচ্ছিলো। শোনা যায় এ ধরণের অভুতপূর্ব সমস্যার মুখোমুখি হয়ে অনেক চাকমা ভাষায় পঠন-পাঠন করার জন্য চিহ্নিত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাঁদের নিজ নিজ বিদ্যালয় পরিদর্শকের দরবারে সমস্যা সমাধানরে দিগনির্দেশের জন্যে উপস্থিত হয়েছিলেন। বলাবাহুল্য, ওঁরা কেউই এই অস্বাভাবিক সমস্যার সমাধান বাতলাতে পারেননি। চতুর্থতঃ, যেহেতু চাকমা বিষয়টিকে প্রথম থেকেই একটি আবশ্যিক বিষয় হিসেবে চালু করা হয়নি এবং পাশাপাশি অন্য সব বিষয় মাতৃভাষার বদলে অন্য আরেকটি ভাষায় শেখানো হচ্ছিল, তাই অনেক চাকমা ছেলে-মেয়ে নিজের ভাষার বিষয়টিকে ধীরে ধীরে একটি অনাবশ্যক বোঝা বলেই মনে করতে থাকলো এবং ত্রিপুরার চাকমা জনগনেরও তথাকথিত মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণের মোহ কাটতে থাকলো। তার উপরে আছে নিজস্ব হরফ থাকা সত্তে¡ও অন্য একটি হরফ চাপিয়ে দেওয়ার চাপা ক্ষোভ। এর ফলে দেখা গেল চাকমাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের অধিকার দেওয়ার ৬ বছরের মাথায় ২০১০ সালে যখন আরও ২৯ টি বিদ্যালয়ে চাকমা ভাষায় পঠন-পাঠনের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে তখন তথাকথিত মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণে কেউ আর উৎসাহী নয়। আজ ২০১২ সালের মাঝামাঝিতে এসে মুখ্যমন্ত্রী যখন সংখ্যালঘু ভাষা গুলির উন্নতির জন্য পৃথক ডিরেক্টরেট গঠণ করছেন, চাকমা ভাষাকে চাকমা হরফে চালু করার কথা ঘোষণা করছেন তখন দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় যে সরকার ঘোষিত ৫৮ টি বিদ্যালয়ের কোন বিদ্যালয়েই আর চাকমা বিষয় পড়ানো হয়না।

তার চাইতেও দুঃখজনক ব্যাপার হল যেসব চাকমা ভাষা ও চাকমা সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন সদস্যদের নিয়ে চাকমা ভাষা উন্নয়ন উপদেষ্ঠা কমিটি গঠণ করা হয়েছিল তাদের কেওই এসব সমস্যা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়াতো দূরের কথা কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা তার খবর নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেননি। শোনা যায় বিদ্যালয়গুলিতে চাকমা ভাষায় সঠিকভাবে পঠন-পাঠন হচ্ছে কিনা তার খোঁজ না রাখার জন্য উপদেষ্ঠা কমিটির সভাপতি বিধায়ক অরুন কুমার চাকমা সহ সকল সদস্যদের বিদ্যালয় শিক্ষামন্ত্রী তপন চক্রবর্তীর কাছে কয়েকবার গালমন্দও শুনতে হয়েছিল। চিহ্নিত বিদ্যালয়গুলি নিয়মিত ভিজিট করতে যাওয়ার জন্য শিক্ষামন্ত্রীনাকি প্রয়োজনবশতঃ যানবাহন দেবারও প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু এসব স্বঘোষিত চাকমা ভাষা উন্নয়ণকারীদের কেউই সে কথায় কর্ণপাত করেননি। কারণ কমিটিতে কে কে আছে সে হিসেবেই ওনারা কমিটির মূল্যায়ণ করতে অভ্যস্ত কমিটিটি কি কি কাজ করলো সে হিসেবে নয়।

তাই বলছিলাম, আন্দোলনকারীগনকে মুখ্যমন্ত্রী চাকমা ভাষা উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন, এর আগেই আগামী শিক্ষা বর্ষ থেকে চাকমা ভাষাকে চাকমা হরফে চালুর ক্যাবিনেট সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা দিয়েছেন, সবই ঠিক আছে। কিন্তু মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের সুয়োগ, যা সরকার ইতিমধ্যেই দিয়ে রেখেছেন তার প্রকৃত বাস্তবায়নে যে যে প্রতিবন্ধকতা গুলি দেখা দিয়েছিল সেগুলির কোন সমাধান সূত্র কি তিনি দিয়েছেন ? সব আন্দোলনকারীই বলবেন, না। তাহলে ? আর খোদ মুখ্যমন্ত্রীকেই যদি সমস্যাগুলির সমাধানের কোন রাস্তা সত্যি সত্যি জিগ্যেস করা হোত তাহলে আমার মনে হয় ওনার সরকারের বিদ্যালয় পরিদর্শকগুলির মতোই তিনিও হতবাক হয়েই চেয়ে থাকতেন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s